পর্ব–১ (বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন)
নিজস্ব প্রতিবেদক: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. ময়নুল হককে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধারাবাহিক এবং কাঠামোবদ্ধ অনিয়মের চিত্র হিসেবে সামনে আসছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তা এখন প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে ঠিকাদার সমাজ এবং দুর্নীতি অনুসন্ধানকারী মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই এস. এম. ময়নুল হকের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট ধরণের “প্রভাব বলয়” গড়ে ওঠে, যা ধীরে ধীরে টেন্ডারভিত্তিক কমিশন বাণিজ্যের একটি সুসংগঠিত কাঠামোতে রূপ নেয়।
শুরুর সময় থেকেই অভিযোগের ছায়া
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভাষ্যমতে, এস. এম. ময়নুল হক যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পে দরপত্র আহ্বানের আগেই অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয়ে যেত কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে। এরপর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য টেন্ডার ডকুমেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হতো যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।
একজন সাবেক ঠিকাদারের ভাষায় (নাম প্রকাশ না করার শর্তে),
“অনেক সময় টেন্ডার খোলার আগেই বোঝা যেত কার কাজ নিশ্চিত। শর্ত এমনভাবে লেখা থাকত, আমরা কাগজপত্র দেখেই বুঝতাম প্রতিযোগিতা শুধু নামমাত্র।”
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও শর্ত প্রণয়নের অভিযোগ
সূত্রগুলো বলছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল “টেন্ডার স্পেসিফিকেশন” বা শর্ত নির্ধারণ।
অভিযোগ অনুযায়ী—
অভিজ্ঞতার শর্ত ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ানো হতো
নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা প্রযুক্তির শর্ত যুক্ত করা হতো
আর্থিক সক্ষমতার সীমা এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে নতুন বা স্বাধীন ঠিকাদাররা অংশ নিতে না পারে
এর ফলে একটি ছোট গোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের প্রকল্প পেয়ে আসছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের একটি সূত্র বলছে,
“টেন্ডার যেন প্রতিযোগিতা নয়, বরং অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী বণ্টনের মতো হয়ে গিয়েছিল।”
কমিশন বাণিজ্যের কাঠামো নিয়ে অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কমিশন বাণিজ্য। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রকল্পের আকার অনুযায়ী নির্দিষ্ট শতাংশ কমিশন নির্ধারিত থাকত, যা ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে আদায় করা হতো।

অভিযোগকারীদের মতে—
বিল পাস করাতে কমিশন দিতে হতো
কাজ পাওয়ার আগে অগ্রিম সমঝোতা করতে হতো
কাজ শেষের পরও অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের জন্য কমিশন প্রযোজ্য ছিল
এই প্রক্রিয়ায় একটি “অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি” তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রগুলোর দাবি—
অনেক প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে
কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি
প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও বিলের মধ্যে বড় ধরনের অমিল ছিল
একজন প্রকৌশলী সূত্র বলেন,
“কাগজে যেটা দেখানো হতো, বাস্তবে অনেক সময় তার অর্ধেকও থাকত না। কিন্তু বিল পুরোটা চলে যেত।”
দলীয় ঠিকাদার বলয় গঠনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, এস. এম. ময়নুল হকের আশেপাশে একটি “বিশ্বস্ত ঠিকাদার বলয়” তৈরি হয়, যারা নিয়মিত সরকারি প্রকল্প পেত।
এই বলয়ের বাইরে থাকা ঠিকাদারদের ক্ষেত্রে অভিযোগ—
টেন্ডার বাতিল
অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা
বিলম্বিত মূল্যায়ন
এবং প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হতো
ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
দুদকে অভিযোগ ও প্রশাসনিক নীরবতা
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি—
অভিযোগ জমা পড়লেও তদন্ত ধীরগতির
অভ্যন্তরীণ প্রভাবশালী মহলের কারণে ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে
অথবা অভিযোগগুলো এখনো যাচাই পর্যায়ে রয়েছে
তবে বিষয়টি নিয়ে গণপূর্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একটি প্রশ্নের শুরু: এটি কি ব্যক্তিগত অনিয়ম, নাকি কাঠামোগত সমস্যা?

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের প্রতিফলনও হতে পারে।
একজন প্রশাসনিক বিশ্লেষক বলেন,
“যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তাহলে এটি ব্যক্তি নয়—বরং পুরো টেন্ডার ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।”
Copyright Disclaimer :- Under section 107 of the Copyright Act 1976, Allowance Made For “fair use” For Purposes such as Criticism, Comment , News, Reporting, Teaching, Scholarship, And Research, Fair Use is a use permitted by copyright States That Might otherwise infringing Non-profit, educational or personal use tip the balance in favor of fair use.